মুরগি ছেড়ে টার্কিতে ঝুঁকছেন রাজবাড়ীর খামারিরা

সারা দেশেই পোলট্রি খামারিদের দুর্দিন চলছে। গত কয়েক বছরের মধ্যে খামারের সংখ্যা ব্যাপকভাবে বেড়ে যাওয়ার পাশাপাশি খাদ্য ও ওষুধের দাম বৃদ্ধি, বিপরীতে ব্রয়লার মুরগি ও ডিমের দাম কমে যাওয়ায় এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। এ অবস্থায় ধারাবাহিক লোকসানের পর ঘুরে দাঁড়াতে টার্কি পালনের দিকে ঝুঁকছেন রাজবাড়ীর খামারিরা। খরচ অত্যন্ত কম হওয়ায় দ্রুতই জনপ্রিয় হচ্ছে এই পাখি পালন। দেশে টার্কির ডিম ও মাংসের বাজার এখনো বেশ ছোট হলেও ভালো দাম পাওয়ায় বেশ লাভ করছেন খামারিরা।

গোয়ালন্দ উপজেলার চার তরুণ উদ্যোক্তা ২০১৪ সালে শেখ হ্যাচারিজ নামে গড়ে তোলেন পোলট্রি হ্যাচারি। ১৫ লাখ টাকা বিনিয়োগ করে মাত্র তিন বছরের মাথায় তাদের মূলধন দাঁড়ায় কোটি টাকার বেশি। কিন্তু বার্ড ফ্লুর প্রাদুর্ভাব, বাচ্চার দাম কমে যাওয়া ও উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ায় ২০১৭ সালের প্রথম দিক থেকেই হোঁচট খায় এ হ্যাচারি। এরপর থেকে ক্রমাগত লোকসান দিয়ে অবশেষে বন্ধ হয়ে যায়।

হ্যাচারিটির অংশীদার আলিমুজ্জামান মিলন বলেন, প্রথম তিন বছর প্রতিটি বাচ্চা ৩০ থেকে ৫০ টাকায় বিক্রি করে ভালো লাভ করেছেন তারা। শেষ পর্যন্ত এই দাম ৩-৪ টাকায় নেমে আসে। অনেক সময় ক্রেতা পাওয়াও মুশকিল হয়ে যায়। ফলে হ্যাচারি বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয়েছেন তারা।

তিনি জানান, প্রায় এক বছর হ্যাচারি বন্ধ থাকার পর স্থানীয় টার্কি খামারি কুদ্দুস আলমের সফলতা দেখে নতুন উদ্যোগ নেন তারা। শুরু করেন টার্কির খামার। এরই মধ্যে খামারের ঘর মেরামত, বৈদ্যুতিক লাইনসহ কাজ শেষের দিকে। শিগগিরই খামারে বাচ্চা তুলবেন।

বৃহত্তর ফরিদপুরের মধ্যে রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ ও পাংশায় সবচেয়ে বেশি পোলট্রি খামার ও হ্যাচারি রয়েছে। কিন্তু বর্তমানে অধিকাংশের অবস্থাই খারাপ। কোনো রকম ব্যবসা চালিয়ে নিচ্ছেন খামারিরা। তাদের মধ্যে অনেকেই শেখ হ্যাচারিজের মতো মুরগি বাদ দিয়ে শুরু করেছেন টার্কির খামার।

নতুন উদ্যোক্তাদের মধ্যে সফলতম একজন হলেন গোয়ালন্দ উপজেলার জামতলা এলাকার কুদ্দস আলম। সাংবাদিকতা পেশায় ছিলেন। হঠাৎ করে প্রতিষ্ঠানটি বন্ধ হয়ে গেলে দিশেহারা হয়ে পড়েন তিনি। এরপর ইন্টারনেট ঘেঁটে গত বছরের আগস্টে ৮০টি টার্কির বাচ্চা নিয়ে শুরু করেন খামার। বর্তমানে তার খামারে ছোট-বড় পাঁচশ টার্কি রয়েছে। এর মধ্যে ৬৫টি ডিম দিচ্ছে। প্রতি হালি ডিম বিক্রি করছেন গড়ে ১ হাজার টাকায়, বাচ্চা বিক্রি করছেন প্রায় দেড় হাজার টাকা জোড়া।

কুদ্দস আলম বলেন, প্রতি মাসে কমপক্ষে ১ লাখ টাকার টার্কি বিক্রি করেন, এতে লাভ থাকে ৫০-৬০ হাজার টাকা। কারণ টার্কিকে কেনা ফিড দিতে হয় না। সাধারণ ঘাস, লতাপাতা, সবজি দিয়েই চলে।

টার্কি পালনের আরেক সফল খামারি পাংশা উপজেলার সরিষা ইউনিয়নের বৃত্তিডাঙ্গা গ্রামের সোহরাব মেম্বার। তার খামারে টার্কি আছে সাড়ে তিনশ। তিনি একই সঙ্গে ডিম ও মাংস বিক্রি করছেন। তার দেখাদেখি স্থানীয় বেকার যুবকরাও এগিয়ে আসছেন। এমনকি পোলট্রি খামারিদের অনেকে মুরগি বাদ দিয়ে টার্কি পালন শুরু করেছেন।

রাজবাড়ী জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা মো. আবু বকর সিদ্দিক বলেন, টার্কি পালন এখন একটি লাভজনক ব্যবসা। রাজবাড়ীর বিভিন্ন এলাকা থেকে টার্কি পালন বিষয়ে জানতে খামারিরা আমাদের কাছে আসছেন। যারা আগে থেকে শুরু করেছেন তারা এখন খুব খুশি।

জেলা প্রাণিসম্পদ কার্যালয়ের তথ্যমতে, রাজবাড়ী জেলায় সাড়ে তিন হাজার টার্কি রয়েছে। তবে কতগুলো খামার আছে তার কোনো সঠিক পরিসংখ্যান তারা দিতে পারেননি। অন্যদিকে জেলায় প্যারেন্ট স্টক ১১টি, ২১১টি লেয়ার, ৮৬২টি ব্রয়লার, ৯টি হাঁস, ১২৫টি কবুতর ও ১৫টি কোয়েল পাখির খামার রয়েছে।

Please follow and like us:

Post Reads: 223 Times

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *